যখন সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তবু ভালোবাসার হাত ছাড়তে নেই

স্টিভেন জেরার্ড: এক অমর কাব্যের নাম

আমাদের লিভারপুলের ঘরের ছেলে

শতাব্দীতে একবারই বোধহয় এমন এক প্রাণের জন্ম হয়, যার শিরার ভেতর দিয়ে রক্ত নয়, বরং ক্লাবের প্রতিটি স্পন্দন আর দীর্ঘশ্বাস বয়ে চলে। স্টিভেন জেরার্ড আমাদের লিভারপুলের সেই ঘরের ছেলে, যে সবুজ মাঠের ঘাসে শুধু পা রাখেনি, বিছিয়ে দিয়েছিল নিজের আস্ত একটা আত্মা। লাল জার্সি গায়ে তাকে যখন অ্যানফিল্ডের টানেলে দাঁড়াতে দেখতাম, মনে হতো আমাদের হাজারো ভক্তের কৈশোর আর যৌবনের সবটুকু আবেগ ওই মানুষটার পায়ে এসে জমা হয়েছে। তার সেই অটল নিষ্ঠা কোনো চুক্তির কাগজে বা ব্যাংক ব্যালেন্সের অঙ্কে কখনো বাঁধা পড়েনি; ওটা ছিল এক অদ্ভুত মায়া, এক বুক জেদ আর আজন্ম লালিত এক পবিত্র প্রেমের বন্ধন।

যখন আমাদের ক্লাব সাফল্যের সোনালি আলোয় ভেসেছে, সে ছিল সেই উৎসবের অগ্রবর্তী মশাল। আবার যখন চারদিকে পরাজয়ের ঘোর অন্ধকার মেঘ জমেছে, যখন জয়ের সব পথ একে একে বন্ধ হয়ে আসছিল, তখন সে একাই হয়ে উঠেছিল এক অবিনশ্বর অগ্নিশিখা। সে আমাদের পথ দেখাত নিঃশব্দে, অসীম সাহসে আর নিঃস্বার্থ আত্মদানে। উত্তাল ঝড়ের রাতে সে ছিল আমাদের ভরসার শেষ দেয়াল, আর মাঝসমুদ্রে যখন আমাদের স্বপ্নের নৌকাটা ডুবুডুবু, তখন সে একাই শক্ত হাতে ধরে রাখত সেই ভাঙা হাল। ইস্তাম্বুলের সেই রূপকথার রাত থেকে শুরু করে অ্যানফিল্ডের সাধারণ কোনো বিষণ্ণ বিকেল, সবখানেই মিশে আছে তার লড়াকু ঘাম আর জয়ের অদম্য নেশা। তার কাছে ওই লাল রঙটা স্রেফ একটা ফেব্রিক ছিল না, ওটা ছিল তার নিঃশ্বাস, তার অস্তিত্ব আর তার জীবনের একমাত্র ধ্রুবতারা।

আজও লিভারপুলের সেই প্রিয় আঙিনা থেকে কত নতুন নতুন প্রতিভা উঠে আসে। কারো পায়ে থাকে জাদুকরী ছোঁয়া, কারো চোখে থাকে আগামীর সেনাপতির দীপ্তি। তাদের অনেকেই জেরার্ড হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে খুব যত্ন করে সেই ঐতিহ্যবাহী জার্সিটা গায়ে জড়ায়। কিন্তু জেরার্ড হওয়া তো শুধু নিখুঁত লং-পাস দেওয়া কিংবা মাঝমাঠ থেকে গোলার মতো বুলেট গোল করা নয়।

জেরার্ড হওয়া মানে নিজের স্বপ্নকে ক্লাবের অস্তিত্বের সাথে চিরতরে গেঁথে ফেলা। কেরিয়ারের মধ্যগগনে কত বড় বড় হাতছানি তাকেও প্রলুব্ধ করেছিল, 'হ্যাঁ' বললে হয়তো দুহাত ভরে ট্রফি আর অঢেল রাজকীয় ঐশ্বর্য পেত। কিন্তু সে মাথা উঁচু করে শান্ত গলায় 'না' বলতে পেরেছিল। কারণ তার কাছে লিভারপুলের একটা ম্যাচ জেতা মানে ছিল তার নিজের শহরের মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। ওই এক টুকরো হাসির কাছে পৃথিবীর সব ঐশ্বর্যই তার কাছে ছিল অতি তুচ্ছ।

আসলে সবাই জেরার্ড হতে চায়, কিন্তু দিনশেষে সবাই তা পারে না। কারণ কিছু ভালোবাসা থাকে একদম নিখাদ আর দুর্লভ, যা অন্য কোনো কিছুর বিনিময়ে কখনো কেনাবেচা করা যায় না। কিছু মানুষের গল্প সময়ের স্রোতে ফিকে হয়ে যায় না, বরং রয়ে যায় ইতিহাসের অক্ষয় ধ্রুবতারা হয়ে। সময় আসবে, সময় যাবে, মাঠের রক্ত-মাংসের মানুষগুলোও বদলে যাবে একের পর এক। কিন্তু লিভারপুলের ইতিহাসের পাতায় কান পাতলে আজও শোনা যায় তার হৃদপিণ্ডের শব্দ। কিছু হৃদয়ের রঙ কোনোদিনও ম্লান হয় না, কিছু লয়্যালিটি কখনো ফুরিয়ে যায় না। জেরার্ড আমাদের কাছে স্রেফ একজন ফুটবলার নয়, সে এক আজন্ম লালিত আবেগের নাম, এক না বদলানো অমর প্রেমের মহাকাব্য।

সে ছিল আমাদের সেই প্রাণপ্রিয় ধ্রুবতারা, যে শেখাতে এসেছিল, পৃথিবীর সব পথ যদি বন্ধ হয়ে যায়, আকাশ যদি ভেঙে পড়ে মাথার ওপর, তবুও ভালোবাসার হাতটা ছাড়তে নেই। সে ছিল সেই নির্ভরতার নাম, যার পাশে দাঁড়ালে মনে হতো এই নিঃসঙ্গ পৃথিবীতে আমরা অন্তত কেউ কখনো একা পথ চলব না। আকাশ ছোঁয়া তো খুব সহজ, কিন্তু কজন পারে মাটির গভীর টানে মিশে থাকা এক অমর কাব্য হতে? সবাই তো একটু সুখের নেশায় ঘর ছেড়ে পরবাসী হয়, কিন্তু কেউ কেউ ওই এক লাল রঙের মায়াতেই কাটিয়ে দেয় সহস্র জনম।

ইতিহাসের পাতায় সোনার মুকুট হয়তো অনেকের ভাগ্যেই জোটে, কিন্তু কজন হতে পারে কোটি হৃদয়ের সিংহাসনে বসা এক অঘোষিত সম্রাট? জেরার্ড তো স্রেফ পায়ের জাদুকর ছিল না, সে ছিল এক নিঃস্বার্থ প্রেমিকের হৃদপিণ্ড থেকে জন্ম নেওয়া সেই ধ্রুবতারা, যে পথ হারানো অন্ধকারেও আমাদের শিখিয়েছিল, ভালোবাসা মানে শুধু জয় নয়, ভালোবাসা মানে আমৃত্যু পাশে থাকা।

সে যেন সেই একরোখা প্রেমিক, যার কাছে হাজারো রূপসীর প্রলোভন ছিল তুচ্ছ, কারণ তার চোখের সমস্তটুকু কাজল জুড়ে ছিল শুধুই ওই প্রিয় লাল জার্সি। সে ট্রফি জেতার চেয়ে বেশি ভালোবেসেছিল আমাদের এই শহরের ধুলিকণা আর গ্যালারির প্রতিটি চিৎকারকে। আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, দেখি মাঠের ঘাসে সে শুধু দৌড়ায়নি, সে এঁকে দিয়েছিল এক আজন্ম লালিত বিশ্বস্ততার আলপনা। লোকে বলে সে ফুটবল খেলেছে, কিন্তু আমরা জানি, সে আসলে মাঠের বুকে তার আস্ত একটা কলিজা রেখে গেছে, যা আজও আমাদের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে স্পন্দিত হয়। কিছু মানুষ শুধু নাম হয় না, কিছু মানুষ হয়ে ওঠে এক একটা বেঁচে থাকার অঙ্গীকার, ঠিক যেমন জেরার্ড ছিল আমাদের সেই না ফুরানো আবেগের শেষ আশ্রয়।

Post a Comment

Cookie Consent
Shiekh Mahin serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.