ম্যানচেস্টার সিটি ছাড়ছে পেপ গার্দিওলা। একজন কট্টর লিভারপুল ফ্যান হিসেবে নিউজটা দেখে প্রথমে হয়তো খুশি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বুকটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল।
ফুটবল শুধু ট্রফি আর ৩ পয়েন্টের হিসাব নয়, ফুটবল হলো একটা আবেগ। আর সেই আবেগের একটা বিশাল অধ্যায় জুড়ে ছিলো পেপ গার্দিওলা ও ইয়ুর্গেন ক্লপ।
ক্লপ যখন অ্যানফিল্ডের ডাগআউটে, তখন এই পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি আমাদের কি পরিমাণ পেইন দিছে, ১ পয়েন্টের ব্যবধানে লিগ কেড়ে নেওয়া, প্রতিটা ম্যাচে স্নায়ুর চরম পরীক্ষা, সেই কারণে পেপের ওপর একটা চিরন্তন অভিমান সবসময় ছিল। কিন্তু সেই অভিমান কখনো ঘৃণায় রূপ নেয়নি। কারণ, একজন ফুটবলপ্রেমী হিসেবে পেপের ট্যাক্টিস আর ব্যক্তিত্বকে সম্মান না করে উপায় ছিল না।
ব্যক্তিগতভাবে ২০১৪ বিশ্বকাপের পর থেকে জার্মানির যেকোনো ফুটবলার বা ব্যক্তিত্বকে আমি মনেপ্রাণে অপছন্দ করি। একজন ব্রাজিলিয়ান হিসেবে সেই ক্ষতটা কোনোদিন শুকানোর নয়। কিন্তু ইয়ুর্গেন ক্লপ ছিলেন এক জাদুকর। একজন জার্মান হয়েও তিনি এমনভাবে আমার মন জয় করেছিলেন যে, ক্লপ ছাড়া লিভারপুল আর লিভারপুল ছাড়া ক্লপকে কল্পনা করাও আমার কাছে দুঃস্বপ্ন ছিল। ক্লপ যখন অ্যানফিল্ড ছাড়লো, আমার ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছিল। এতটাই ব্যথিত হয়েছিলাম যে, বেশ কিছুদিন লিভারপুলের খেলা দেখাই বন্ধ করে দিয়েছিলাম।
আমার মন হুট করে কারো জন্য গলে না। আগে মাঠে পারফর্ম করে প্রমাণ করতে হবে, তারপর আমার পছন্দের তালিকায় জায়গা মিলবে, তা সে যতই বড় রাইভাল হোক না কেন।
ঠিক যেমনটা ঘটেছিল অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের ক্ষেত্রে।
একজন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় লিভারপুলে এসে ফিলিপে কুতিনহো আর সাদিও মানের রেখে যাওয়া ১০ নম্বর জার্সিটা গায়ে জড়াল, শুরুতে বিষয়টা আমি একদমই হজম করতে পারিনি। মানিয়ে নিতে পারছিল না দেখে শুরুতে অনেক ট্রল করেছি, গালিও দিয়েছি। কিন্তু আস্তে আস্তে তার খেলা, তার নিবেদন আমাকে মুগ্ধ করল। আজ আমি তার হেটার্স থেকে চরম ভক্তে পরিণত হয়েছি। আজ লিভারপুলের সেরা তিনজন প্রিয় খেলোয়াড়ের নাম বলতে গেলে ম্যাক অ্যালিস্টারের নাম নিশ্চিতভাবেই থাকবে।
এমনকি বায়ার লেভারকুসেনের ফ্লোরিয়ান ভির্টজকেও জার্মান হওয়ায় এখন আমার তেমন ভালো লাগে না।
তবে সে যদি তার ফর্মে ফিরে আসে, নিজেকে প্রমাণ করতে পারে, হয়তো তার প্রতিও কোনোদিন মন নরম হবে।
পেপ গার্দিওলাও ঠিক এই ক্যাটাগরির। সে নিজের যোগ্যতা দিয়ে, পারসোনালিটি দিয়ে আমার শ্রদ্ধা কেড়ে নিয়েছে। আর বিশেষ করে ক্লপের প্রতি তার যে সম্মান, তাদের মধ্যকার যে দারুণ বন্ধুত্ব ছিলো সেটায় পেপের প্রতি আমার ভালোলাগাকে আকাশচুম্বী করে তুলেছিল।
আমি রাইভাল দলের খেলা সাধারণত কখনই দেখি না।
জীবনে মাত্র একবারই ম্যানচেস্টার সিটির পক্ষ নিয়ে তাদের খেলা দেখেছিলাম আর সেটা ছিলো ইন্টার মিলান vs ম্যানচেস্টার সিটির চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল।
এছাড়া তাদের খেলা কখনোই আমাকে টানেনি।
ক্লপ আমাদের ছেড়ে যাওয়ার পর যতবারই পেপ অ্যানফিল্ডে এসেছে, প্রতিবারই বুকটা কেঁপে উঠত। পেপকে দেখলেই ক্লপকে বড্ড মিস করতাম, মিস করতাম ডাগআউটে তাদের সেই হাসিমুখের আলিঙ্গন আর বন্ধুত্বের মুহূর্তগুলো।
ক্লপ তো চলে গেছে আগেই, সেই শোক আজও কাটিয়ে উঠতে পারিনি আমরা প্রত্যেকটা লিভারপুল ফ্যান। আর এখন শুনছি ক্লপের সেই প্রিয় বন্ধু, ফুটবলীয় যুদ্ধের শেষ সঙ্গী পেপ গার্দিওলাও এই সিজন শেষে সিটি ছেড়ে চলে যাচ্ছে!
রাইভাল হিসেবে ভাবলেও ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা লাগছে।
ক্লপ ছাড়া যেমন লিভারপুল কল্পনা করতে পারতাম না, ঠিক তেমনি পেপ ছাড়া সিটিকে কল্পনা করা অসম্ভব।
ক্লপের চলে যাওয়ার পর ডাগআউটের শেষ চেনা মানুষটাও হারিয়ে যাচ্ছে,
এটা ভাবলেই চোখে জল চলে আসে।
আমি জানি না সিটি ফ্যানরা এই সত্যিটা কীভাবে মেনে নেবে।
এটা যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক, তা একজন লিভারপুল ফ্যান হিসেবে আমি খুব ভালো করেই বুঝি।
ম্যানচেস্টার সিটি কি কখনো পেপের যোগ্য উত্তরসূরি পাবে? নাকি আমাদের মতোই তারাও প্রতিটা ম্যাচে, প্রতিটা মুহূর্তে পেপকে মিস করবে আর ডাগআউটের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলবে?
বিদায় পেপ গার্দিওলা।
একজন রাইভাল ফ্যানের পক্ষ থেকেও তোমার জন্য রইল পরম শ্রদ্ধা।
ফুটবল বিশ্ব তোমাদের এই দ্বৈরথ আর বন্ধুত্ব চিরকাল মনে রাখবে।
